গত ১৫ বছরে ফাসিস্ট আওয়ামী লীগ দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত কাঠামো প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ধংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করে দিয়েছে, গণমাধ্যম এবং বিচার বিভাগে করেছে অপ্রত্যাশিত হস্তক্ষেপ, আর ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা কৌশলী নিপীড়নের রূপ ছিল আরো বেশি বেদনাদায়ক। তেমনি একটি প্রেক্ষাপটে তরুন ছাত্রনেতা নুরুল হক নুরের টিকে থাকা, ন্যায্যতার লড়াই এবং স্পষ্ট কথা, নিছক সাহসিকতা নয় -এক ধরণের রাজনৈতিক দৃঢ়তা।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যারা ‘সংস্কার’-এর অঙ্গীকার নিয়ে এসেছে, অল্প সময়েই তাদের মধ্যেও অনিয়মের ছাপ বহন করতে শুরু করেছে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, আইনের শাসনের দুর্বলতা, এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন। এই বাস্তবতায়, ফের নুরুল হক নুরের প্রতিবাদী কন্ঠ অব্যাহত থেকেছে। তিনি শুধু উপদেষ্টা-সচিবদের অনিয়ম নয়, বরং ধর্ষণ, মব কালচার, চাঁদাবাজি, অবৈধ গ্রেফতার, গনমামলা এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধেও সোচ্চার থেকেছেন। তাঁর প্রতিবাদে রয়েছে এক ধরণের স্বচ্ছতা যা এই বিভক্ত ও দিশাহীন রাজনীতিতে খুব কমই দেখা যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসর দীর্ঘদিন ধরে যেখানে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি, দলীয় আনুগত্য এবং গোষ্ঠীনির্ভর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত, সেখানে নুরুল হক নূর এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। তিনি সেই বিরল কণ্ঠস্বর, যিনি ক্ষমতার অলিন্দ থেকে নয়, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ থেকে উঠে এসেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় স্পষ্ট, এবং শাসকের কাছে বরাবরই অস্বস্তিকর।
২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নতুন করে আলোচনায় আশার আলো হয়ে আবির্ভাব হয় নুরের, যখন দেশের তরুণরা এক গভীর হতাশার মধ্যে দিশা খুঁজছিল। ঐ আন্দোলন তাঁকে এনে দেয় শুধু জাতীয় পরিচিতিই নয়, একটি নৈতিক অবস্থানও যেখানে তিনি রাজনৈতিক শ্রেণির বহু প্রচলিত চালচলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। অন্য অনেক আন্দোলনকর্মী সময়ের সাথে বিলীন বা প্রচলিত দলীয় রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হলেও নুর তা করেননি। বরং নিজস্ব অবস্থানে থেকে আরও স্পষ্ট, আরও অনমনীয় হয়ে উঠেছেন। এরপর তিনি ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ডাকসু নির্বাচনে নুর ভিপি পদে বিজয়ী হন। হাসিনাযুগে রাজনীতির হিসাব-নিকাশে প্রায় অসম্ভব বলে ধরা হয়েছিল এই জয়। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের প্রার্থীকে হারিয়ে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে তার বিজয় ছিল এক রাজনৈতিক বিস্ময়। এটি তাকে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে এবং তাকে বিদ্যমান ছাত্র রাজনীতির “প্রতিপক্ষের মুখ” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর তিনি রাজনৈতিক দল ‘গণঅধিকার পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। যার আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট এটি একপ্রকার কর্তৃত্ববাদবিরোধী প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নুর নিজেকে শুধুমাত্র আরেকজন প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং একটি বিকল্প রাজনৈতিক ভাষার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তাঁর বক্তব্যে নেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চটক, আছে সংবিধান, নাগরিক অধিকার, এবং কাঠামোগত সংস্কারের কথা। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে মূলত তাঁর এই অনমনীয় অবস্থান থেকেই।
তাঁর এই উত্থান প্রচলিত রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না। বাংলাদেশের রাজনীতি বিশাল, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গভীর, এবং প্রায়শই হিংস্রভাবে আত্মরক্ষামূলক। তবে তরুণ প্রজন্ম যখন পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন নুরের মতো কণ্ঠস্বর শুধু প্রতিক্রিয়া নয় — বরং পুনর্গঠনের সম্ভাবনাও হয়ে উঠছে।
তাঁকে যদি কেবল একজন আন্দোলনকারী হিসেবে খাটো করে দেখা হয়, তাহলে বুঝে উঠা যাবে না যে ভেতরে ভেতরে কী এক গর্জন জমে উঠছে — এক অধৈর্য তরুণ প্রজন্ম, এক ক্লান্ত গণতন্ত্র, এবং একটি ধারণা, যার সময় হয়তো এসেই গেছে।
ডাকসু-পরবর্তী সময়ে নুর একের পর এক আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী সমাবেশে হামলার শিকার হন তিনি ও তার সংগঠনের সদস্যরা। এর পরের বছরগুলিতে হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তার তার রাজনৈতিক জীবনের এক অনিবার্য অংশে পরিণত হয়।
পটুয়াখালীর গলাচিপার প্রত্যন্ত চর বিশ্বাস গ্রামে জন্ম নেওয়া নুরের শৈশব জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তার বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং সাবেক ইউপি সদস্য। আট ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় নুর স্থানীয় স্কুল থেকে শুরু করে গাজীপুরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পেরিয়ে অবশেষে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।
নুর ২০১৬ সালে বিয়ে করেন চরবিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাতেম আলীর মেয়ে মারিয়া আক্তার লুনাকে। বর্তমানে এই দম্পতির তিনটি সন্তান রয়েছে। নানা ঝুঁকির পরও নুরের জীবনযাত্রা এখনও সাধারণ, যা তার জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে টাঙ্গাইলে এক যুব সংগঠন তাকে “গণবন্ধু” উপাধি দেয়। কিন্তু ঐতিহাসিক বিচারে এই উপাধির যথার্থতা কতটুকু থাকবে, সেই প্রশ্নও করেন অনেকে। তার বিরোধীরা তাকে অভিজ্ঞতাহীন ও কৌশলগতভাবে দুর্বল বলে প্রচার করলেও তরুণ প্রজন্ম তাকে দেখছে এক প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে—যিনি সাহসের সঙ্গে অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়া এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধা। আজকের হতাশজনক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে নতুন কণ্ঠগুলো হয় নিঃস্ব হয়ে যায়, নয়তো বিক্রি হয়ে যায়—নুরুল হক নুর সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, একা এবং অপ্রতিরোধ্য।